Daily Khulnar Khobor
প্রিন্টের তারিখঃ ১২:০০:০০ এএম   |   প্রকাশের তারিখঃ 06-10-2026 ইং
সিজারের টাকা ছিলনা অসহায় জহুরার পাশে দাড়ালো কয়রা হাসপাতাল
সিজারের টাকা ছিলনা অসহায় জহুরার পাশে দাড়ালো কয়রা হাসপাতাল
প্রতিনিধি, ফয়সাল হোসেন [ কয়রা প্রতিনিধি ] ।।

হাতে এক টাকাও নেই। পাশে বৃদ্ধা মা ছাড়া আপন বলতে যেন কেউ নেই। গভীর রাতে প্রসববেদনায় কাতর অসহায় বাকপ্রতিবন্ধি জহুরা খাতুন।

চিকিৎসক জানালেন, জরুরি ভিত্তিতে দ্বিতীয়বার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করতে হবে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাড় করার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। ঠিক এমন সংকটময় মুহূর্তে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেয় কয়রা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

কোনো টাকা ছাড়াই জরুরি অস্ত্রোপচার করে জহুরা খাতুনের কন্যা শিশুর জন্ম দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, সার্জন ফি, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয় না নিয়েই মা ও নবজাতককে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

৪৫ বছর বয়সী জহুরা খাতুন পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালী ইউনিয়নের গড়ইখালী গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি কয়রা উপজেলার হায়াতখালী বাজারের মঠবাড়ী এলাকায় বসবাস করেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রায় পাঁচ মাস আগে তার স্বামী হবি গাইন তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর বৃদ্ধা মাকে নিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটছিল জহুরার। এরই মধ্যে গভীর রাতে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে কয়রা হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, দ্রুত দ্বিতীয়বার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করতে হবে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের খরচ তো দূরের কথা, পরিবারের হাতে তখন একটি টাকাও ছিল না। বৃদ্ধা মায়ের অসহায় মুখ আর বাক্‌প্রতিবন্ধী মেয়ের পরিস্থিতি দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মানবিক সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থের কথা না ভেবে রাতেই জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়। সফল অস্ত্রোপচারের পর জহুরা খাতুন একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে মা ও নবজাতক দুজনেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। অস্ত্রোপচারের পরও পরিবারের দুশ্চিন্তা কাটেনি।

সার্জন ফি বাবদ ৭ হাজার টাকা দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না তাদের। বিষয়টি জানতে পেরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই টাকাও নেয়নি। পরে ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয় বাবদ আরও প্রায় ১৩ হাজার টাকা প্রয়োজন হলেও অসহায় পরিবারের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি। এদিকে বিষয়টি জানতে পারেন কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি কয়রা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আলমগীর হোসেনকে ফোন করে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর কাছ থেকে আর কোনো টাকা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, চিকিৎসা, ওষুধ ও অন্যান্য সেবার খরচ ছাড়াই মা ও নবজাতককে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি পাঠানো হয়েছে। জহুরার পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনাটি যেন অন্ধকারের মধ্যে একটু করো আলো। অর্থের অভাবে যখন সন্তান জন্মদানের মতো জরুরি চিকিৎসাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সেই সংকট কেটে যায়।

কয়রা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, রোগীর পরিবারের অসহায়ত্বের বিষয়টি জানার পর মানবিক কারণে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। মা ও নবজাতক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, অর্থের অভাবে অনেক অসহায় মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে একজন দরিদ্র ও বাক্‌প্রতিবন্ধী মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে, তা অন্য প্রতিষ্ঠান ও বিত্তবানদেরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করবে। অসহায় পরিবারের পক্ষ থেকে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।

তাদের ভাষ্য অর্থের অভাবে যখন চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাশে দাঁড়ানোয় মা ও নবজাতক দুজনই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন।

© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ Daily Khulnar Khobor
🏠 হোম